রাত তখন আড়াইটা। সারা গ্রাম নিঝুম হয়ে গেছে, কেবল শীতের
ঝাপটা মাঝে মাঝে টিনের চালে আছড়ে পড়ছে। জাফর তার অন্ধকার ঘরে সিলিং ফ্যানের স্থির
ব্লেডগুলোর দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। পাশে নীলার সুশৃঙ্খল নিঃশ্বাসের শব্দ—স্প্রেটা
কাজ করেছে, সে এখন গভীর ঘুমে।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
'খক... খকখক...
খুউউউ...'
একটা দমচাপা কাশির শব্দ। বাবা কাশির দমকটা থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, সেটা স্পষ্ট
বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু শরীর তো আর শাসন মানে না। শব্দটা দেয়াল ভেদ করে জাফরের কানে
তপ্ত সিসার মতো এসে বিঁধছে। জাফর বালিশটা চেপে ধরল। সে জানে, এই কাশির কোনো
ছন্দ নেই, এটা একবার শুরু হলে শেষ হতে চায় না।
'খকখক... খক...'
এবার শব্দটা একটু চড়া হলো। নীলা একটু নড়ে উঠল। জাফরের বুকটা ধক করে
উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, "বাবা, একটু থামুন। আর কয়েকটা মিনিট..."
নীলা পাশ ফিরল। জাফরের মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে চলে এসেছে। সে
অন্ধকারের মধ্যেই দেখল নীলা উঠে বসেছে। তার ছায়াটা দেয়ালে এক দানবীর মতো দেখাচ্ছে।
"উফ! শুরু
হয়েছে আবার?" নীলার গলাটা ঘুমের ঘোরেও কর্কশ। "মানুষটা কি ইচ্ছা
করে এমন করে? একটু কি পানি খেয়ে কাশিটা থামালে হয় না? কাল সকালে আমার অফিস আছে, সেটা কি কারো
খেয়াল আছে?"
জাফর চুপ করে রইল। কোনো প্রতিবাদ নয়, কেবল অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে
শুয়ে থাকা—এটাই তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
"তুমি কি
পাথরের মূর্তি হয়ে বসে থাকবে?" নীলা এবার জাফরের গায়ে একটা ধাক্কা দিল। "যাও না, ওনাকে এক
গ্লাস পানি দিয়ে এসো। আর বলো, আমরা মানুষ, আমাদের একটু ঘুমের দরকার আছে।"
জাফর বিছানা ছাড়ল। সে টর্চটা না জ্বালিয়েই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে
হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বাবার ঘরের দিকে গেল। ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করতেই দেখল, বাবা খাটের
ওপর বসে আছেন। লেপটা মেঝেতে পড়ে গেছে। হারিকেনটা নিভে গেছে অনেক আগে। চাঁদের এক
ফালি ম্লান আলো জানালার শিকের ভিতর দিয়ে এসে বাবার সাদা চুলের ওপর পড়েছে। বাবাকে দেখাচ্ছে
একখণ্ড পাথরের মূর্তির মতো, যা কেবল কাঁপছে।
"বাবা..."
জাফর অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে বাবার কাঁধ স্পর্শ করল।
বাবা ধক করে একটা নিঃশ্বাস নিলেন। "নীলা... নীলা জাগছে রে বাজান? আমার তো কোনো
হাত নাই। কাশিটা যে কথা শোনে না..."
বাবার গলার স্বরটা এতটাই ক্ষীণ যে মনে হচ্ছিল পরপার থেকে ভেসে আসছে।
জাফর দেখল বাবার শরীরটা ঘামে ভিজে গেছে। এই হাড়কাঁপানো শীতেও কাশির ধমকে মানুষটা
ঘামছেন। জাফরের ইচ্ছে করল বাবার পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে। বলতে ইচ্ছে করল— 'বাবা, আমি একটা
অপদার্থ! আপনার জন্য এক ফাইল সিরাপ আনার হিম্মত আমার নেই, কারণ আপনার
পুত্রবধূ মুখ ভার করে থাকবে।'
কিন্তু জাফর কিছুই বলল না। সে কেবল টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি
ঢালল। সেই পানিটুকুও বরফের মতো ঠান্ডা।
"পানি খাও
বাবা।"
বাবা কম্পিত হাতে গ্লাসটা নিলেন। দু-এক চুমুক খাওয়ার পর কাশিটা একটু
কমল। বাবা ক্লান্ত হয়ে বালিশে মাথা রাখলেন।
"তুই যা জাফর, গিয়া শুইয়া
পড়। বউ অশান্তি করব।" বাবা বিড়বিড় করে বললেন।
জাফর বাবার ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের কুয়াশাটা যেন জানালার
শিকগুলো গিলে খেতে চাইছে। সে যখন নিজের ঘরে ফিরল, দেখল নীলা আবার লেপ মুড়ি দিয়ে
শুয়ে পড়েছে।
"বলেছ ওনাকে?" নীলার
গলার স্বর লেপের তলা থেকে অস্পষ্টভাবে এল।
"হুম।"
জাফর মিথ্যে বলল।
সে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু ঘুম এল না। তার কানের ভেতর এখন
কেবল একটা শব্দই বাজছে—বাবার সেই নিঃশব্দ কাশির প্রতিধ্বনি। সে বুঝতে পারল, এই কাশি কেবল
একটা শারীরিক অসুখ নয়; এটা হলো এই জরাজীর্ণ সংসারের একটা হাহাকার, যা জাফর শত
চেষ্টা করেও চাপা দিতে পারছে না।
আকাশের ওই পারে কোথাও কি ভোর হবে?
জাফরের মনে হলো, তার জীবনের
সূর্যটা অনেক আগেই মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।